রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি!!!
বাঙালি জাতি, আমাদের কাজকাম আজগুবি। এখনো আমরা বাঙালি জাতি ব্রিটিশ বেনিয়ানদের তাবেদারি করার মন-মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয় নি। আমাদের মন মানসিকতা রয়ে গেছে গােলামীর জিঞ্জিরে বাঁধা। আমি এই লেখায় কিছু অসংগতি তুলে ধরছি।
খৎনা এবং ‘হাজাম’
আমরা বাঙালি জাতি খৎনা করেছি গ্রামে। যারা খৎনা করত তাদেরকে ‘হাজাম’ বলা হত। সমাজে হাজামদের স্থান খুব মর্যাদার নয়। যেসময় মুসলিম সম্প্রদায়ের অতি আবশ্যকীয় এই কাজটি করত কােন কােন গ্রামের দু একটি পরিবারের অশিক্ষিত লোক। তারা ব্লেড অথবা বাঁশের ধারালো টল দিয়ে খৎনার কাজ সম্পাদন করত।
তারা ব্যাথা নাশক ট্যাবলেটও লিখে দিত। যাদের দ্বারা মুসলিমদের এই অতি আবশ্যকীয় কাজটি সম্পাদন হত মুসলিম সমাজই তাদেরকে হেয় চােখে দেখত।
তাদের বংশের লােককেও হাজামের বংশের লোক বলে আত্বীয়তা করতে চায়না অনেকেই। কিন্ত এই একই কাজ করছে পাস করা ডাক্তার। ডাক্তারের কাছে এনে এখন খৎনার কাজটি সম্পাদন করেন অনেকেই। তাে যে ডাক্তার খৎনার কাজ করল সে হল সার্জন। আর গ্রামে করলে হাজাম। তাদের জাত নেই।
খৎনা করা ডাক্তারের সাথে মেয়ে বিয়ে দিতে কারো আপত্তি নেই। অথচ একই কাজ করে যদি গ্রামের লোকটা হাজাম হয় তবে ডাক্তার সাহেবও হাজাম! একই কাজের দুই শানে নুজুল হতে পারে না।
আজব দেশ! আমরা আজব দেশের বাঙালি জাতি!
হাতে করে চুড়ি বিক্রি করলে চুড়িওয়ালা। তাকে কমজাত বলে গণ্য করা হয় অথচ ডিপার্ট মেন্টাল স্টােরে তা বিক্রি করলে কারো জাত যায় না!
মাংস যারা বিক্রি করে তাদেরকে কসাই বলে। তারা সমাজে অতি নগণ্য বলে গণ্য করা হয়। কিন্ত বড় বড় ডিপার্ট মেন্টাল স্টােরে মাছ- মাংস যারা বিক্রি করেন তারা অভিজাত!
জেলে সম্প্রদায় মাছ বিক্রি করে বলে তাদেরকে মৎসজীবি বলা হয়। তারা একটি সম্প্রদায়। সিলেটে মৎস জীবিদের অমৎসজীবিরা তুচ্চার্থে ‘মাইমল’ বলে। কিন্ত এখন মৎসজীবিদের হাতে মাছের ব্যবসা তেমন একটা নেই। অনেকাংশে তাদের স্বাধীনতা ও খর্ব হচ্ছে। বড়বড় মাছের আড়ৎ ও খামার অ মৎসজীবিদের। অ মৎসজীবিরা মৎসজীবিদের জীবিকায় হাত দিয়েছেন। এখন কে কাকে ‘মাইমল’ বলবেন?
সেলুন ব্যবসা যারা করে তারা নর সুন্দর। তাদেরকে নাপিত বলা হয়। কিন্ত নাপিতের ব্যবসাটিও আর নাপিতের দখলে নেই। কুলিনরাই নাপিতের ব্যবসাটি নিয়ে ধাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। নাপিত আপনি কাকে বলবেন?
গ্রাম থেকে শহরে এসে অনেকেই চৌধুরী বনে যায়। অনেকে বাসা বাড়ি করে নেইমপ্লেট লাগায় চৌধুরী ভিলা। কাগজ পত্রেও চৌধুরী লেখা শুরু করে ।
এটা দেখে অনেক সময় আসল চৌধুরীরা নামের আগে চৌধুরী লেখা ছেড়ে দিয়েছে। তাে আমার মনে হয় ইংরেজদের তাবেদার লোকজন চৌধুরী উপাধি পেয়ে নিজেকে কুলিন মনে করে।
বাঙালি জাতির পরিচয় কি
আর নব্য চৌধুরীরা নিজে নিজেই তাদের উপাধি ঠিক করে। তবে উভয় ই ব্রিটিশদের তাবেদারিকে ধারণ করে নিজের মর্যাদা বাড়াতে চায়! দুপক্ষের মধ্যে তফাতটা কােথায়?
আমার এক আত্বীয় সে এমন চৌধুরী ছিল যে কারো মুখের দিকে চেয়ে কথা বলত না। বলত আকাশের দিকে চেয়ে। তার অহৎকার এতবেশী ছিল যে কাউকে মানুষই মনে করতনা। মারা গেছেন স্ট্রােক করে। মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়েছিল গলগল করে। মরার সময় কােন মানুষ তার কাছেই ছিল না। প্রকৃতি নিরব প্রতিদান দিয়েছে।
কােন গরীব লোক ভিক্ষা করলে আমরা বাঙালি জাতি তাকে ভিক্ষুক বলি। ভিক্ষুকের গোষ্টীর সাথেও কেউ কুটুম্বিতা করতে চায় না।
অথচ আমাদের সমাজটাই ভিক্ষুকে ভরে গেছে! বাঙালি জাতি আমরা বাঙালি জাতি কােন না কােনভাবে হাতপাতি।
কেউ ঘুসের জন্য, কেউ উপহার উপঢৌকনের জন্য কেউ আবার বিয়েতে কিছু পাওয়ার জন্য কেউ কাজ দিতে কেউ চাকরি দিতে হাত পাতেন, তাে এই অবস্থায় কাকে ভিক্ষুক বলা যায়?
বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পরিচয়
জমিদারী প্রথা উঠে গেলেও আজও তার রেশ রয়েছে অন্যখানে। মার্কেটের মালিকরা বনে গেছেন জমিদার। মানুষ মার্কেটে দােকানকােটা কিনেও জমিদার সেলামি দেয় মাসে মাসে।
আমাদের তাবেদারি মানসিকতা চেঞ্জ করতে পারিনা। গাঁটের টাকায় দােকান ক্রয় করেও জমিদার সেলামি দিতে হয়। জমিদার হিসেবে কােন ট্যাক্স দেয়া তাে অবৈধ।
তাে এটা চলছে কেন?
হা তিনি এই ভূমিটুকুর অথবা মার্কেটের মালিক ও প্রতিষ্ঠাতা সে হিসেবে উনাকে সন্মানি হিসেবে মাসে মাসে কিছু অর্থ দেয়া যেতে পারে।
টাকা দিয়ে যারা দােকান ক্রয় করে ব্যবসা করছেন তারা কি সব রায়ত প্রজা!? আসলে আমরা বাঙালি জাতি এভাবেই কিছু মানুষকে যুগে যুগে মুনিব বানিয়েছি নিজের বে আক্কেলির দরুন অথবা গােলামীর মনোবৃত্তির দরুণ!
একজন নারী জীবন-জীবিকার তাগিদে রাস্তায় নেমে পুরুষ শিকার করলে সে হয়ে যায় বেশ্যা, পতিতালয়ে থাকলে বেশ্যা মাগী।
অথচ পর্দার আড়ালে বসে হাই সোসাইটির যারা দেহের ভাঁজে দেহ রেখে অঢেল অর্থ কামাই করে দুহাতে উড়ায়, বিলাসিতা করে তাদের কে আমরা কি বলব?
কাজী একটি পেশা। একজন কাজী হলে তার চৌদ্দ সিড়ির লোকজনও কাজী লেখা শুরু করে দেন! এই কু সংস্কার কেন? বাঙালি জাতি আমরা কি আমাদের মান মর্যাদা শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান গরিমায় উজ্জল করতে পারি না?
আমাদের এত দৈন্যতা কেন? বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা কি মানব মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারি না? তবে কি বিশ্ব কবির ভাষায় আজও বলতে হবে-
রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি!
যিনি রাজ প্রাসাদে থাকেন
তার অহংকার করার কিছুই নেই
কিন্ত রাজ প্রাসাদে থাকার অবস্থা থাকতেও
যিনি সাধারণের মত থাকেন অহংকারের বরণ ঢালা তার গলায় মানায়।
আহমেদ বকুল
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন